ইসরায়েল-সমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতি, ফিলিস্তিনিদের ওপর রেকর্ড বসতি হামলার বছর
পশ্চিম তীর: ইসরায়েল-সমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতি, ফিলিস্তিনিদের ওপর রেকর্ড বসতি হামলার বছর
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে — অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আর বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
জানুয়ারি ২০২৩ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত। প্রায় ৫,৯০০ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়ি, চারণভূমি ও পানির উৎস ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জেনিন, তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর নতুন করে বাস্তুচ্যুত।
ওসিএইচএ অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ৬.৬টি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা — রেকর্ডে সর্বোচ্চ। ২৪ জুলাই পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীরা ১৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যা ২০২৩ সালের ১৬ জনের রেকর্ডকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে।
এই প্রতিবেদনটি HRW-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের মাঠ পর্যায়ের তদন্ত, ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ, ইসরায়েলি সরকারি বাজেট নথি, এবং ওসিএইচএ, ইয়েশ দিন, কেরেম নাভোট ও পিস নাউ-এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রতিবেদনের মূল যুক্তি: পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কেবল কয়েকজন উগ্র বসতি স্থাপনকারীর কাজ নয় — এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নীতি, যার লক্ষ্য “সর্বোচ্চ ভূমি, সর্বনিম্ন ফিলিস্তিনি।”
১. সারসংক্ষেপ
২০২২ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি একসঙ্গে ত্বরান্বিত হয়েছে। HRW নথিভুক্ত করেছে যে বসতি স্থাপনকারীরা এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ইউনিট, দ্রুত প্রতিক্রিয়া স্কোয়াড, এবং সরকারি বাজেট থেকে পাওয়া এটিভি, নাইট ভিশন ও ড্রোন ব্যবহার করে সংগঠিত হামলা চালাচ্ছে।
- বাস্তুচ্যুতি এখন কাঠামোগত: ১০৭টি পশুপালক ও কৃষি সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি সরাসরি জীবিকা ধ্বংস, চারণভূমিতে প্রবেশে বাধা, পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিদিনের হয়রানির ফল।
- দায়মুক্তি নিয়মে পরিণত: ২০০৫ সাল থেকে ইয়েশ দিন-এর ট্র্যাকিং অনুযায়ী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে মাত্র ৩% অভিযোগে সাজা হয়েছে। N12-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০২৩ থেকে বসতি সহিংসতার পুলিশ মামলা ৭০% কমেছে। ২০১৯ সাল থেকে মাত্র ১ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
- এরিয়া বি-তেও সম্প্রসারণ: যেখানে আগে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানেও নতুন আউটপোস্ট ও বেসরকারি নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট বসছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই-এর উপদেষ্টা মতামতে স্পষ্ট করেছে — পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখল বেআইনি, সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া চলমান, এবং এটি জাতিগত পৃথকীকরণ ও বর্ণবাদের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে। আদালত ইসরায়েলকে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নিতে, বাস্তুচ্যুতদের ফিরে আসতে দিতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে।
২. পদ্ধতি ও প্রমাণ ভিত্তি
HRW ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে সাতটি সম্প্রদায়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চালায়: আল-মুঘাইয়ির, মিখমাস, তাইবেহ, জালুদ, কারিউত, খিরবেত হুমসা এবং মুয়াররাজাত পূর্ব। দলটি ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী, স্থানীয় কাউন্সিল সদস্য এবং চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
সাক্ষ্যের পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয়েছে মোবাইল ভিডিও, বাড়ির সিসিটিভি, অ্যাম্বুলেন্স জিপিএস লগ, এবং ইসরায়েলি ভূমি প্রশাসনের নোটিশ। প্রতিটি হামলার সময়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, পোশাক (সামরিক ইউনিফর্ম/আধা-ইউনিফর্ম/মুখোশ) এবং ইসরায়েলি সেনা বা পুলিশের উপস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা হয়েছে।
৩. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো
প্রতিবেদনটি দেখায় যে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রাষ্ট্রীয় বাজেট, অস্ত্র এবং আইনি সুরক্ষায় পুষ্ট। এটি কোনো “নিয়ন্ত্রণহীন যুবক”-এর কাজ নয়।
বসতি নিরাপত্তা উপাদানের জন্য বরাদ্দ। এর মধ্যে রয়েছে এটিভি, নাইট ভিশন ডিভাইস, ড্রোন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম। সেটেলমেন্ট বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট ২০২৩ থেকে ১২২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর দ্রুত নিয়োগ। এর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের অধীনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া স্কোয়াড (Rapid Response Squads) এবং আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স শিথিল করা হয়েছে। অনেক হামলাকারীকে আধা-সামরিক পোশাকে দেখা গেছে।
২০০৫ সাল থেকে বসতি সহিংসতায় দোষী সাব্যস্তের হার (ইয়েশ দিন)
২০২৩ থেকে পুলিশ মামলা দায়ের কমেছে (N12)
২০১৯ সাল থেকে ফিলিস্তিনি হত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী
৪. বসতি সম্প্রসারণ: মানচিত্র পাল্টে দেওয়া
ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইসরায়েল ১০৪টি নতুন বসতি স্থাপন করেছে। এর ফলে পশ্চিম তীরে সরকার-স্বীকৃত বসতির মোট সংখ্যা ১২৭ থেকে বেড়ে ২৩১ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি বসতি গোপনে অনুমোদিত হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, যখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে ছিল।
পশ্চিম তীরের প্রায় ১৮% ভূমি এখন সরাসরি বসতি স্থাপনকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণে — হয় চারণ নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ক্লোজার, বা আউটপোস্টের মাধ্যমে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রকল্প হলো E1। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং ১৮টি বেদুইন সম্প্রদায় সরাসরি উচ্ছেদের মুখে পড়বে। মুয়াররাজাত পূর্বের মতো যারা ১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে এসেছিলেন, তারা দ্বিতীয়বার নাকবার মুখোমুখি।
৫. কেস স্টাডি: চারটি সম্প্রদায়ের গল্প
HRW কর্তৃক যাচাইকৃত সাক্ষ্য, ভিডিও ও মেডিকেল রেকর্ডের ভিত্তিতে
৬. প্যাটার্ন বিশ্লেষণ: কীভাবে বাস্তুচ্যুতি ঘটানো হয়
চারটি কেস থেকে পাঁচটি সাধারণ প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে, যা আন্তর্জাতিক আইনে “জবরদস্তিমূলক পরিবেশ” (coercive environment) হিসেবে পরিচিত:
এই প্যাটার্নের ফল হলো — মানুষ নিজেরাই “স্বেচ্ছায়” চলে যেতে বাধ্য হয়, যদিও আন্তর্জাতিক আইনে এটি পরোক্ষ জোরপূর্বক স্থানান্তর (indirect forcible transfer)।
৭. আইনি কাঠামো — কঠোর বিশ্লেষণ
২০২৫ সালে ICRC-এর হালনাগাদ ভাষ্যে বলা হয়েছে, যদি দখলদার শক্তি এমন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে সুরক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকতে না পারে, তবে তাও পরোক্ষ জোরপূর্বক স্থানান্তর হিসেবে গণ্য হবে।
অনুচ্ছেদ ৮(২)(a)(vii): বেআইনিভাবে নির্বাসন বা স্থানান্তর বা বেআইনি আটক — যুদ্ধাপরাধ।
অনুচ্ছেদ ৭(১)(d): বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তর — মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
- ইসরায়েলের পশ্চিম তীরে দখল বেআইনি এবং তা সংযুক্তিকরণের শামিল।
- জাতিগত পৃথকীকরণ ও বর্ণবাদ (apartheid) নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।
- ইসরায়েলের বাধ্যবাধকতা: বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়া, বাস্তুচ্যুতদের ফেরত ও ক্ষতিপূরণ, এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি।
HRW প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কমান্ড দায়িত্ব হিসেবে নাম উল্লেখ করেছে: সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান আভি ব্লুথ, সাবেক চিফ অফ স্টাফ হারজি হালেভি, বর্তমান চিফ অফ স্টাফ ইয়াল জামির, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ, এবং অর্থমন্ত্রী ও বসতি বিষয়ক মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, যখন রাষ্ট্রীয় বাজেট, অস্ত্র ও আইনি দায়মুক্তি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীকে একটি এলাকা থেকে সরানোর পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা চলে, তখন তা জাতিগত নির্মূলের (ethnic cleansing) সংজ্ঞার মধ্যে পড়তে পারে।
৮. রেকর্ড বছরের উপাত্ত — ২০২৬
৯. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জবাবদিহিতার ঘাটতি
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েকজন সহিংস বসতি স্থাপনকারী ও দুটি আউটপোস্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা কাঠামোগত সমর্থন — বাজেট, অস্ত্র ও সামরিক সুরক্ষা — বন্ধ করেনি। ইসরায়েলি সরকার বরং নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বসতি স্থাপনকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
- পুলিশ মামলা ৭০% কমেছে, তদন্ত দীর্ঘসূত্রিতা এবং ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের থানায় প্রবেশে বাধা।
- সামরিক আইনজীবীরা বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা না করে “নিরাপত্তা” অজুহাতে ফিলিস্তিনি জমিতে ক্লোজার জারি করেন।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এ প্যালেস্টাইন পরিস্থিতির তদন্ত চললেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা।
১০. সুপারিশ
১১. উপসংহার
“এটি সর্বোচ্চ ভূমি এবং সর্বনিম্ন ফিলিস্তিনির নীতি। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সেই নীতির হাতিয়ার।” — সারা সানবার, HRW
খিরবেত হুমসার উম্ম মুহাম্মদ এখন তার ছেঁড়া তাঁবুর পাশে বসে বলেন, “আমরা ভেড়া হারিয়েছি, পানি হারিয়েছি, এখন সম্মানও হারাচ্ছি।” মুয়াররাজাত পূর্বের এক শিশু তার স্কুলের খাতায় লিখেছে, “আমার বাড়ি কোথায়?”
আল-মুঘাইয়িরের এক বাসিন্দা HRW-কে বলেন —
“আমরা বরং এখানে মরতে রাজি, কিন্তু এই পাহাড় ছেড়ে যাব না। এটি আমাদের জলপাই, আমাদের কবর, আমাদের গল্প। ওরা চায় আমরা ভয়ে চলে যাই — আমরা ভয়কে বাড়ি বানিয়ে থাকব।”
এই প্রতিবেদন দেখায়, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কোনো সাময়িক উত্তেজনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী জনসংখ্যা ও ভূমি প্রকৌশল। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট, তথ্য স্পষ্ট, এবং ভুক্তভোগীর কণ্ঠও স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো — জবাবদিহি কবে?
টীকা ও সূত্র
- Human Rights Watch, “West Bank: Israeli-Backed Settler Violence Driving Displacement,” 20 Aug 2026.
- OCHA oPt, Settler violence dashboard, Jan-July 2026 — 6.6 incidents/day average.
- Yesh Din, Law enforcement data 2005-2026 — 3% conviction rate, 70% drop in case filings per N12 investigation 2024.
- Kerem Navot & Peace Now, Settlement and outpost tracking, Dec 2022 - Aug 2026 — 104 new settlements, 248 outposts, ~160 retroactively legalized.
- ICRC Commentary on Fourth Geneva Convention Article 49 (2025 update) — indirect forcible transfer.
- Rome Statute, Art 8(2)(a)(vii) & Art 7(1)(d).
- ICJ Advisory Opinion, Legal Consequences arising from the Policies and Practices of Israel in the Occupied Palestinian Territory, 19 July 2024.
- HRW interviews, Al-Mughayyir, Mikhmas, Taybeh, Jalud, Qaryut, Khirbet Humsa, Muarrajat East, April-May 2026.