Policy Watch
Governance, democracy, accountability, civic participation, public policy, and rights-based institutional reform.
Independent Civic-Policy Platform

Governance, Human Rights, and Public Policy Research

Civic Vision Bangladesh is an independent platform for evidence-based analysis on democratic accountability, institutional reform, minority protection, rule of law, and public policy dialogue in Bangladesh and beyond.

Governance Reform Rights Dignity & protection Policy Research & analysis

Editorial Focus

Independent analysis for democratic renewal, public accountability, civic participation, institutional trust, and evidence-based policymaking.

ResearchPolicy Studies
RightsAccountability Lens
InstitutionalReform
DynamicProfessional UI

Featured Articles & Latest Analysis

Top banner ad zone • paste AdSense unit here after approval

ইসরায়েল-সমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতি, ফিলিস্তিনিদের ওপর রেকর্ড বসতি হামলার বছর

 

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন — পশ্চিম তীর ২০২৬

পশ্চিম তীর: ইসরায়েল-সমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতি, ফিলিস্তিনিদের ওপর রেকর্ড বসতি হামলার বছর

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
স্বাধীন মানবাধিকার রক্ষক ও গভর্নেন্স এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক | ঢাকা, ২১ আগস্ট ২০২৬
HRW • OCHA • ICJ ডেটা ভিত্তিকদীর্ঘ প্রতিবেদন • ১২ অধ্যায়
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২০ আগস্ট ২০২৬উৎস: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ওসিএইচএ, ইয়েশ দিন, কেরেম নাভোট, পিস নাউ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে — অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আর বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

বাস্তুচ্যুতি
১০৭ টি সম্প্রদায়

জানুয়ারি ২০২৩ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত। প্রায় ৫,৯০০ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়ি, চারণভূমি ও পানির উৎস ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

উত্তর পশ্চিম তীরে নতুন শরণার্থী
৩২,০০০+

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জেনিন, তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর নতুন করে বাস্তুচ্যুত।

সহিংসতার হার ও প্রাণহানি
৬.৬ / দিন • ১৫ জন নিহত

ওসিএইচএ অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ৬.৬টি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা — রেকর্ডে সর্বোচ্চ। ২৪ জুলাই পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীরা ১৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যা ২০২৩ সালের ১৬ জনের রেকর্ডকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে।

এই প্রতিবেদনটি HRW-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের মাঠ পর্যায়ের তদন্ত, ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ, ইসরায়েলি সরকারি বাজেট নথি, এবং ওসিএইচএ, ইয়েশ দিন, কেরেম নাভোট ও পিস নাউ-এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রতিবেদনের মূল যুক্তি: পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কেবল কয়েকজন উগ্র বসতি স্থাপনকারীর কাজ নয় — এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নীতি, যার লক্ষ্য “সর্বোচ্চ ভূমি, সর্বনিম্ন ফিলিস্তিনি।”

১. সারসংক্ষেপ

২০২২ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি একসঙ্গে ত্বরান্বিত হয়েছে। HRW নথিভুক্ত করেছে যে বসতি স্থাপনকারীরা এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ইউনিট, দ্রুত প্রতিক্রিয়া স্কোয়াড, এবং সরকারি বাজেট থেকে পাওয়া এটিভি, নাইট ভিশন ও ড্রোন ব্যবহার করে সংগঠিত হামলা চালাচ্ছে।

প্রধান উপসংহার
  • বাস্তুচ্যুতি এখন কাঠামোগত: ১০৭টি পশুপালক ও কৃষি সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি সরাসরি জীবিকা ধ্বংস, চারণভূমিতে প্রবেশে বাধা, পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিদিনের হয়রানির ফল।
  • দায়মুক্তি নিয়মে পরিণত: ২০০৫ সাল থেকে ইয়েশ দিন-এর ট্র্যাকিং অনুযায়ী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে মাত্র ৩% অভিযোগে সাজা হয়েছে। N12-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০২৩ থেকে বসতি সহিংসতার পুলিশ মামলা ৭০% কমেছে। ২০১৯ সাল থেকে মাত্র ১ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
  • এরিয়া বি-তেও সম্প্রসারণ: যেখানে আগে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানেও নতুন আউটপোস্ট ও বেসরকারি নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট বসছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই-এর উপদেষ্টা মতামতে স্পষ্ট করেছে — পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখল বেআইনি, সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া চলমান, এবং এটি জাতিগত পৃথকীকরণ ও বর্ণবাদের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে। আদালত ইসরায়েলকে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নিতে, বাস্তুচ্যুতদের ফিরে আসতে দিতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে।

২. পদ্ধতি ও প্রমাণ ভিত্তি

HRW ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে সাতটি সম্প্রদায়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চালায়: আল-মুঘাইয়ির, মিখমাস, তাইবেহ, জালুদ, কারিউত, খিরবেত হুমসা এবং মুয়াররাজাত পূর্ব। দলটি ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী, স্থানীয় কাউন্সিল সদস্য এবং চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

সাক্ষ্যের পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয়েছে মোবাইল ভিডিও, বাড়ির সিসিটিভি, অ্যাম্বুলেন্স জিপিএস লগ, এবং ইসরায়েলি ভূমি প্রশাসনের নোটিশ। প্রতিটি হামলার সময়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, পোশাক (সামরিক ইউনিফর্ম/আধা-ইউনিফর্ম/মুখোশ) এবং ইসরায়েলি সেনা বা পুলিশের উপস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা হয়েছে।

তদন্তের পরিধি
সম্প্রদায়৭ টি
সাক্ষাৎকার২০ জন
ভিডিও/সিসিটিভি ক্লিপ৩৪+ ঘন্টা
যাচাইকৃত হামলা৭৮ টি (২০২৫-২৬)
HRW জানিয়েছে, ভুক্তভোগীরা প্রতিশোধের ভয়ে অনেক হামলা রিপোর্টই করেন না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা ওসিএইচএ-র ৬.৬/দিনের চেয়েও বেশি হতে পারে।

৩. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো

প্রতিবেদনটি দেখায় যে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রাষ্ট্রীয় বাজেট, অস্ত্র এবং আইনি সুরক্ষায় পুষ্ট। এটি কোনো “নিয়ন্ত্রণহীন যুবক”-এর কাজ নয়।

বাজেট ও সরঞ্জাম
৫০ মিলিয়ন শেকেল (~$১৬ মিলিয়ন)

বসতি নিরাপত্তা উপাদানের জন্য বরাদ্দ। এর মধ্যে রয়েছে এটিভি, নাইট ভিশন ডিভাইস, ড্রোন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম। সেটেলমেন্ট বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট ২০২৩ থেকে ১২২% বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামরিকীকরণ
৫,৫০০ বসতি স্থাপনকারী রিজার্ভিস্ট — আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যাটালিয়ন

৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর দ্রুত নিয়োগ। এর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের অধীনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া স্কোয়াড (Rapid Response Squads) এবং আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স শিথিল করা হয়েছে। অনেক হামলাকারীকে আধা-সামরিক পোশাকে দেখা গেছে।

দায়মুক্তির পরিসংখ্যান
৩%
২০০৫ সাল থেকে বসতি সহিংসতায় দোষী সাব্যস্তের হার (ইয়েশ দিন)
-৭০%
২০২৩ থেকে পুলিশ মামলা দায়ের কমেছে (N12)
১ জন
২০১৯ সাল থেকে ফিলিস্তিনি হত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী

৪. বসতি সম্প্রসারণ: মানচিত্র পাল্টে দেওয়া

ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইসরায়েল ১০৪টি নতুন বসতি স্থাপন করেছে। এর ফলে পশ্চিম তীরে সরকার-স্বীকৃত বসতির মোট সংখ্যা ১২৭ থেকে বেড়ে ২৩১ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি বসতি গোপনে অনুমোদিত হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, যখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে ছিল।

আউটপোস্ট
২৪৮টি আউটপোস্ট, যার মধ্যে ৬৫টি ২০২৬ সালেই স্থাপিত। প্রায় ১৬০টি ইতিমধ্যে পূর্ববর্তীভাবে বৈধ করা হয়েছে।
উৎস: পিস নাউ, কেরেম নাভোট
ভূমি নিয়ন্ত্রণ
১০ লক্ষ দুনাম = ১৮%

পশ্চিম তীরের প্রায় ১৮% ভূমি এখন সরাসরি বসতি স্থাপনকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণে — হয় চারণ নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ক্লোজার, বা আউটপোস্টের মাধ্যমে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রকল্প হলো E1। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং ১৮টি বেদুইন সম্প্রদায় সরাসরি উচ্ছেদের মুখে পড়বে। মুয়াররাজাত পূর্বের মতো যারা ১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে এসেছিলেন, তারা দ্বিতীয়বার নাকবার মুখোমুখি।

৫. কেস স্টাডি: চারটি সম্প্রদায়ের গল্প

HRW কর্তৃক যাচাইকৃত সাক্ষ্য, ভিডিও ও মেডিকেল রেকর্ডের ভিত্তিতে

কেস ১ — খিরবেত হুমসা: মধ্যরাতে মুখোশধারী হামলা

১৩ মার্চ ২০২৬, রাত ১টা

খিরবেত হুমসা জর্ডান উপত্যকায় একটি ছোট বেদুইন পশুপালক সম্প্রদায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৩ মার্চ রাত ১টার দিকে ৮০ থেকে ১০০ জন মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারী লাঠি, পাথর ও রাইফেল নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে। তারা পুরুষদের হাত প্লাস্টিকের জিপ-টাই দিয়ে বাঁধে, শিশুদের সামনে যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ সহিংসতা ও হুমকি দেয়, এবং বলে — “তাঁবু জ্বালিয়ে দেব, তোমরা এখানে থাকলে মরবে।”

প্রমাণ: HRW তিনটি পৃথক ভিডিও যাচাই করেছে যেখানে মুখোশধারীদের পেছনে একটি ইসরায়েলি সামরিক জিপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আহতদের জন্য ডাকা অ্যাম্বুলেন্সকে রো’ই বসতির কাছে চেকপয়েন্টে আটকে দেওয়া হয় প্রায় ৪৫ মিনিট।

“আমার ১১ বছরের ছেলের হাত বেঁধে মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে মাথায় চাপ দিয়েছিল। ওরা হাসছিল।” — এক মা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

কেস ২ — মুয়াররাজাত পূর্ব: দ্বিতীয় নাকবা

৫০ পরিবার • ১৯৪৮ সালের শরণার্থী

মুয়াররাজাত পূর্বের বাসিন্দারা মূলত ১৯৪৮ সালে নাকাব (নেগেভ) থেকে বাস্তুচ্যুত বেদুইন পরিবার। প্রায় ৫০টি পরিবার এখানে কয়েক দশক ধরে বসবাস করছে। ২০২১ সালে তাদের চারণভূমির মাঝখানে একটি আউটপোস্ট স্থাপিত হয়। আউটপোস্টটি তাদের স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টার থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে।

৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে টানা কয়েক সপ্তাহের রাতের হামলা, পানির ট্যাংক ভাঙচুর এবং ভেড়া চুরির পর পুরো সম্প্রদায় পালাতে বাধ্য হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি ভেঙে দেয়, যদিও আদালতের একটি স্থগিতাদেশ ছিল বলে পরিবারগুলো দাবি করে।

“আমরা ১৯৪৮ সালে নাকাব থেকে এসেছিলাম। এখন আবার আমাদের নাকবা হচ্ছে।” — সম্প্রদায়ের এক প্রবীণ

এমনকি এরিয়া এ-তে আল-আওসাজে আশ্রয় নেওয়ার পরও তাদের হয়রানি থামেনি। HRW জানায়, বসতি স্থাপনকারীরা সেখানেও এসে তাদের ভেড়া তাড়িয়ে দেয় এবং স্থানীয়দের “সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছ” বলে হুমকি দেয়।

কেস ৩ — আল-মুঘাইয়ির: স্কুলের পাশে গুলি

৪৩টি হামলা ২০২৫ সালে

রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আল-মুঘাইয়ির গ্রামে ২০২৫ সালে ৪৩টি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা রেকর্ড করা হয়েছে — যা আগের দুই বছরের মোট হামলার সমান। ২০২৩ সাল থেকে এখানে ৩ জন শিশু ও ৪ জন পুরুষ নিহত হয়েছে।

২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে স্কুল ছুটির সময় বসতি স্থাপনকারীরা জলপাই বাগানে ঢুকে গাছ উপড়ে ফেলছিল। বাধা দিতে গেলে ৩২ বছর বয়সী জিহাদ আবু নাইম এবং তার ১৪ বছর বয়সী ভাতিজা আওসকে গুলি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি অনুযায়ী হামলাকারী অসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিফর্ম পরা ছিল এবং তার পেছনে ৪ জন সৈন্য দাঁড়িয়ে ছিল।

ভূমি আদেশের বৈষম্য:
ফিলিস্তিনিদের ৩০০ দুনাম জলপাই জমিতে “প্রবেশ নিষেধ” আদেশ, অথচ একই সময়ে ৬২০ দুনাম বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা পরিষ্কার ও বেড়া দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষ্য:
“সৈন্যরা আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছিল যাতে আমরা আহতদের কাছে যেতে না পারি।” — স্থানীয় শিক্ষক

কেস ৪ — কারিউত: স্নাইপার হামলা ও অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়া

২ মার্চ ২০২৬

নাবলুসের দক্ষিণে কারিউত গ্রামের ২২,০০০ দুনাম জমি এখন ৩৬০ দুনাম এরিয়া বি-তে সংকুচিত। চারপাশে ৭টি আউটপোস্ট। ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে ৩০-৪০ জন বসতি স্থাপনকারী M16 রাইফেল নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে।

গুলিতে ৫২ বছর বয়সী মুহাম্মদ মাথায়, ৪৮ বছর বয়সী ফাহিম পেটে গুলিবিদ্ধ হন, এবং ৪৬ বছর বয়সী জামিল কোনোমতে বেঁচে যান। HRW-এর যাচাইকৃত ভিডিওতে একজন বসতি স্থাপনকারীকে স্নাইপার পজিশনে শুয়ে গুলি করতে দেখা যায়।

অ্যাম্বুলেন্স বাধা

আহতদের নিতে আসা অ্যাম্বুলেন্সকে বসতি স্থাপনকারীরা আটকে দেয়। একজন মা বলেন, “আমার ছেলে মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত, আর ওরা অ্যাম্বুলেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল।” উল্লেখ্য, কারিউতের অ্যাম্বুলেন্স চালক মোহাম্মদ আওয়াদ আল্লাহ মুসা ২০২৪ সালের এপ্রিলে একই ধরনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন।

৬. প্যাটার্ন বিশ্লেষণ: কীভাবে বাস্তুচ্যুতি ঘটানো হয়

চারটি কেস থেকে পাঁচটি সাধারণ প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে, যা আন্তর্জাতিক আইনে “জবরদস্তিমূলক পরিবেশ” (coercive environment) হিসেবে পরিচিত:

১. জীবিকা ধ্বংস
চারণভূমিতে প্রবেশে বাধা, জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা, পানির ট্যাংক ও সোলার প্যানেল ভাঙচুর, ভেড়া চুরি। খিরবেত হুমসায় ১২০টি ভেড়ার মধ্যে ৪০টি এক রাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
২. পানি ও চলাচল অস্বীকার
সামরিক ক্লোজার আদেশ ফিলিস্তিনিদের জন্য, কিন্তু বসতি স্থাপনকারীরা একই জমিতে অবাধে চলাচল করে। অ্যাম্বুলেন্স ও পানির ট্রাক নিয়মিত আটকানো হয়।
৩. এরিয়া বি-তে সম্প্রসারণ
ওসলো চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের এলাকাতেও আউটপোস্ট বসানো হচ্ছে। কারিউতের ৯৮% জমি এখন কার্যত এরিয়া সি-তে পরিণত।
৪. দিন-রাত হয়রানি ও যৌন সহিংসতার হুমকি
রাত ১-৩টায় মুখোশধারী দল, শিশু ও নারীদের সামনে অবমাননাকর আচরণ, বাড়ির দরজায় ‘তোমরা মরবে’ গ্রাফিতি।

এই প্যাটার্নের ফল হলো — মানুষ নিজেরাই “স্বেচ্ছায়” চলে যেতে বাধ্য হয়, যদিও আন্তর্জাতিক আইনে এটি পরোক্ষ জোরপূর্বক স্থানান্তর (indirect forcible transfer)।

৮. রেকর্ড বছরের উপাত্ত — ২০২৬

দৈনিক হামলা
৬.৬
ওসিএইচএ-র রেকর্ডে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে ছিল ৩.৩/দিন।
নিহত (বসতি স্থাপনকারীদের হাতে)
১৫ জন
২৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত। ২০২৩ সালের রেকর্ড ছিল ১৬ জন। আগস্টে এই সংখ্যা রেকর্ড ছাড়াবে বলে আশঙ্কা।
নতুন আউটপোস্ট
৬৫ টি
শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ৭ মাসে। মোট ২৪৮।
১০৭
বাস্তুচ্যুত সম্প্রদায় — জানু ২০২৩ থেকে। এর মধ্যে ৩১টি সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেছে, বাকিগুলো আংশিক। ৫,৯০০ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত।
১M
দুনাম — বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে, যা পশ্চিম তীরের ১৮%। কেরেম নাভোটের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ।

৯. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জবাবদিহিতার ঘাটতি

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েকজন সহিংস বসতি স্থাপনকারী ও দুটি আউটপোস্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা কাঠামোগত সমর্থন — বাজেট, অস্ত্র ও সামরিক সুরক্ষা — বন্ধ করেনি। ইসরায়েলি সরকার বরং নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বসতি স্থাপনকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

জবাবদিহিতার ঘাটতি
  • পুলিশ মামলা ৭০% কমেছে, তদন্ত দীর্ঘসূত্রিতা এবং ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের থানায় প্রবেশে বাধা।
  • সামরিক আইনজীবীরা বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা না করে “নিরাপত্তা” অজুহাতে ফিলিস্তিনি জমিতে ক্লোজার জারি করেন।
  • আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এ প্যালেস্টাইন পরিস্থিতির তদন্ত চললেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা।

১০. সুপারিশ

লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা
সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি তাদের অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক কাউন্সিল ও নিরাপত্তা সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা। স্মোট্রিচ ও বেন-গভিরের মন্ত্রণালয়ের বাজেট লাইন ফ্রিজ করা।
অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত
পশ্চিম তীরে ব্যবহৃত ছোট অস্ত্র, নাইট ভিশন, ড্রোন ও এটিভি রপ্তানি স্থগিত — যতক্ষণ না ইসরায়েল বসতি স্থাপনকারীদের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
বসতি বাণিজ্য নিষেধ
অধিকৃত অঞ্চলের বসতি থেকে আসা পণ্য, বিশেষ করে জলপাই তেল, খেজুর ও নির্মাণ সামগ্রীর আমদানি নিষিদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্থক্যকরণ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।
অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য স্থগিত
ইসরায়েল-ইইউ অ্যাসোসিয়েশন চুক্তির মানবাধিকার ধারা (Article 2) অনুযায়ী বাণিজ্য সুবিধা স্থগিতের প্রক্রিয়া শুরু করা।
ICC সমর্থন
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তে রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন, সাক্ষী সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা।

১১. উপসংহার

“এটি সর্বোচ্চ ভূমি এবং সর্বনিম্ন ফিলিস্তিনির নীতি। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সেই নীতির হাতিয়ার।” — সারা সানবার, HRW

খিরবেত হুমসার উম্ম মুহাম্মদ এখন তার ছেঁড়া তাঁবুর পাশে বসে বলেন, “আমরা ভেড়া হারিয়েছি, পানি হারিয়েছি, এখন সম্মানও হারাচ্ছি।” মুয়াররাজাত পূর্বের এক শিশু তার স্কুলের খাতায় লিখেছে, “আমার বাড়ি কোথায়?”

আল-মুঘাইয়িরের এক বাসিন্দা HRW-কে বলেন —

“আমরা বরং এখানে মরতে রাজি, কিন্তু এই পাহাড় ছেড়ে যাব না। এটি আমাদের জলপাই, আমাদের কবর, আমাদের গল্প। ওরা চায় আমরা ভয়ে চলে যাই — আমরা ভয়কে বাড়ি বানিয়ে থাকব।”

এই প্রতিবেদন দেখায়, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কোনো সাময়িক উত্তেজনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী জনসংখ্যা ও ভূমি প্রকৌশল। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট, তথ্য স্পষ্ট, এবং ভুক্তভোগীর কণ্ঠও স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো — জবাবদিহি কবে?

টীকা ও সূত্র

  1. Human Rights Watch, “West Bank: Israeli-Backed Settler Violence Driving Displacement,” 20 Aug 2026.
  2. OCHA oPt, Settler violence dashboard, Jan-July 2026 — 6.6 incidents/day average.
  3. Yesh Din, Law enforcement data 2005-2026 — 3% conviction rate, 70% drop in case filings per N12 investigation 2024.
  4. Kerem Navot & Peace Now, Settlement and outpost tracking, Dec 2022 - Aug 2026 — 104 new settlements, 248 outposts, ~160 retroactively legalized.
  5. ICRC Commentary on Fourth Geneva Convention Article 49 (2025 update) — indirect forcible transfer.
  6. Rome Statute, Art 8(2)(a)(vii) & Art 7(1)(d).
  7. ICJ Advisory Opinion, Legal Consequences arising from the Policies and Practices of Israel in the Occupied Palestinian Territory, 19 July 2024.
  8. HRW interviews, Al-Mughayyir, Mikhmas, Taybeh, Jalud, Qaryut, Khirbet Humsa, Muarrajat East, April-May 2026.
লেখক
লেখক পরিচিতি
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
স্বাধীন মানবাধিকার রক্ষক ও গভর্নেন্স এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক

ঢাকা-ভিত্তিক গবেষক, যিনি গত এক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে মানবাধিকার, বাস্তুচ্যুতি এবং বসতি ঔপনিবেশিকতা নিয়ে কাজ করছেন। এই প্রতিবেদনটি HRW, OCHA এবং ICJ-এর প্রাথমিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষায় প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের পাঠকরা পশ্চিম তীরের বর্তমান বাস্তবতা গভীরভাবে বুঝতে পারেন।

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ • ঢাকা • সর্বস্বত্ব: উন্মুক্ত জ্ঞান — অ-বাণিজ্যিক পুনঃপ্রকাশ অনুমোদিত সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে

Read Full Analysis

Download CVB App

CVB App Logo
Mobile Platform

Civic Vision Bangladesh App

Access policy analysis, governance insights, human rights commentary, and civic accountability content from Civic Vision Bangladesh on your mobile device.

Download APK Visit CVB

Language & Translation